06/11/2026 দুর্নীতির বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় শক্তি সামাজিক মূল্যবোধের জাগরণ: মনিরামপুরে দুদকের বিতর্ক প্রতিযোগিতা
সমসাময়িক
১০ জুন ২০২৬ ১৫:৫৬
মোঃ শাহ্ জালাল।। দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গঠনের সংগ্রামে কেবল আইন, বিধি কিংবা প্রশাসনিক সংস্কারই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন মানুষের বিবেকের জাগরণ, নৈতিকতার চর্চা এবং সামাজিক মূল্যবোধের পুনরুদ্ধার। পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সমাজের প্রতিটি স্তরে সততা ও ন্যায়বোধের চর্চা নিশ্চিত করা গেলে দুর্নীতির বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা সম্ভব বলে মত দিয়েছেন বক্তারা।
বুধবার (১০ জুন) যশোরের মনিরামপুর উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) সমন্বিত জেলা কার্যালয়, যশোরের উদ্যোগে এবং উপজেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির আয়োজনে অনুষ্ঠিত ‘বিতর্ক প্রতিযোগিতা-২০২৬’-এর সমাপনী ও পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে বক্তারা এসব কথা বলেন।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে মনিরামপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. সম্রাট হোসেন বলেন, “দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই কেবল প্রশাসনের একার দায়িত্ব নয়। সমাজের প্রতিটি মানুষকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে সততা ও দায়িত্ববোধের চর্চা করতে হবে। শিশুদের মধ্যে ছোটবেলা থেকেই নৈতিক শিক্ষা, দেশপ্রেম এবং জবাবদিহিতার মানসিকতা গড়ে তুলতে পারলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম একটি দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ বিনির্মাণে নেতৃত্ব দেবে। আজকের শিক্ষার্থীরাই আগামী দিনের রাষ্ট্রনায়ক, প্রশাসক ও নাগরিক; তাই তাদের মধ্যে সততার বীজ বপন করাই আমাদের সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ।”
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে দুদকের সমন্বিত জেলা কার্যালয়, যশোরের সহকারী পরিচালক মো. আল-আমীন বলেন, “দুর্নীতি শুধু আইনের বিষয় নয়, এটি একটি সামাজিক ও নৈতিক সংকট। আইন প্রয়োগ দুর্নীতি দমন করতে পারে, কিন্তু দুর্নীতির মানসিকতা দূর করতে পারে না। সেই কাজটি করতে পারে পরিবার, শিক্ষা ও সামাজিক মূল্যবোধ। তরুণ প্রজন্মকে দুর্নীতিবিরোধী চেতনায় উদ্বুদ্ধ করতে পারলে রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠান আরও স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক হয়ে উঠবে।”
সভাপতির বক্তব্যে মনিরামপুর উপজেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি অধ্যাপক মো. মুহিব বুল্লাহ বলেন, “সামাজিক মূল্যবোধ হারিয়ে গেলে কোনো প্রশাসনিক সংস্কারই দীর্ঘস্থায়ী সুফল দিতে পারে না। সততা, ন্যায়পরায়ণতা, মানবিকতা ও দায়িত্ববোধ—এই চারটি গুণকে পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে হবে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রকৃত লড়াই শুরু হয় মানুষের বিবেক থেকে। সেই বিবেক জাগ্রত করতে শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিতর্ক, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ও সচেতনতামূলক আয়োজন অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা পালন করে।”
প্রতিযোগিতায় সততা সংঘের সদস্যদের অংশগ্রহণে দুটি গ্রুপের মধ্যে বিতর্ক অনুষ্ঠিত হয়। গ্রুপ ‘ক’-এর বিষয় ছিল ‘দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সামাজিক মূল্যবোধের তুলনায় অর্থনৈতিক উন্নয়ন প্রয়োজন’ এবং গ্রুপ ‘খ’-এর বিষয় ছিল ‘দুর্নীতি প্রতিরোধে যুবসমাজের সক্রিয়তা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ভূমিকার চাইতেও কার্যকর’। পরে উভয় গ্রুপের বিজয়ী দলের মধ্যে চূড়ান্ত বিতর্ক অনুষ্ঠিত হয় ‘দুর্নীতি নির্মূলে সামাজিক মূল্যবোধের পুনরুদ্ধার প্রশাসনিক সংস্কারের চাইতেও গুরুত্বপূর্ণ’ শীর্ষক বিষয়ে।
উপজেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি অধ্যাপক মো. মুহিব বুল্লাহর সভাপতিত্বে এবং সাধারণ সম্পাদক রবিউল ইসলাম মিঠুর সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত অনুষ্ঠানে মডারেটর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন উপজেলা একাডেমিক সুপারভাইজার মো. মাসুদ হোসেন।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন দুদকের সহকারী পরিদর্শক সুমিত দাস, মনিরামপুর প্রেসক্লাবের সভাপতি এস এম মজনুর রহমান, সাধারণ সম্পাদক মোতাহার হোসেন দুষ্টু, উপজেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সহ-সভাপতি জিএম ফারুক আলম, সদস্য সহকারী অধ্যাপক উম্মে হাবিবা, উন্নয়নকর্মী সুরাইয়া নার্গিসসহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা।
বিতর্ক প্রতিযোগিতার বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন মনিরামপুর মহিলা ডিগ্রি কলেজের সহকারী অধ্যাপক মো. মফিজুর রহমান, পিন্টু কুমার সাধুখাঁ, উপজেলা গ্রাম আদালত সমন্বয়কারী অনুপম কুমার ঘোষ এবং শিক্ষক আব্দুস সবুর। এছাড়া উপস্থিত ছিলেন উপজেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সদস্য মো. শফিকুল ইসলাম, মনিরামপুর সরকারি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. সিরাজুল ইসলাম তালুকদার, মনিরামপুর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. তছির উদ্দীন এবং উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষক সমিতির সভাপতি প্রধান শিক্ষক মো. হামিদুল ইসলাম।
অনুষ্ঠানের শেষে প্রধান অতিথি বিজয়ী দলের সদস্যদের হাতে পুরস্কার তুলে দেন। বক্তারা আশাবাদ ব্যক্ত করেন, এ ধরনের আয়োজন শিক্ষার্থীদের মধ্যে সততা, ন্যায়বোধ, দেশপ্রেম ও দুর্নীতিবিরোধী চেতনা বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে একটি নৈতিক ও জবাবদিহিমূলক সমাজ গঠনে অনুপ্রাণিত করবে।
অনুষ্ঠানের সার্বিক ব্যবস্থাপনায় ছিল উপজেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটি, মনিরামপুর এবং সহযোগিতায় ছিল উপজেলা প্রশাসন।