06/03/2026 বাংলাদেশর একমাত্র প্রতিষ্ঠান "আমাদের অ্যাম্বুলেন্স" সম্পূর্ণ বিনামূল্যে মৃতদেহ বহন করে থাকে
ছবি- আমাদের অ্যাম্বুলেন্স
২ জুন ২০২৬ ০৬:২৫
মনিরামপুর থেকে।। বাংলাদেশর একমাত্র প্রতিষ্ঠান "আমাদের অ্যাম্বুলেন্স" সম্পূর্ণ বিনামূল্যে মৃতদেহ বহন করে থাকে। যশোরের মনিরামপুর উপজেলার সন্তান মহামারী করোনা যোদ্ধা ডা. মেহেদী হাসান বাবার অসুস্থতায় নিজ উপজেলার স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অ্যাম্বুলেন্স সেবা না পেয়ে প্রতিজ্ঞা করেন তাঁর নিজ এলাকা যশোরের মণিরামপুরে আর্তমানবতার সেবায় চালু করবেন একটি অ্যাম্বুলেন্স সেবা। আর সেই লক্ষ্যে 'আমাদের অ্যাম্বুলেন্স' নামে একটি অ্যাম্বুলেন্স সেবা চালু করেছেন তিনি। নিজস্ব অর্থায়নে কেনা এই অ্যাম্বুলেন্সটির নামকরণ করা হয়েছে 'আমাদের অ্যাম্বুলেন্স'। উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বিনামূল্যে মণিরামপুর উপজেলা বাসীর লাশ বহনের। গত জুন-২০২৪ খ্রি. থেকে বিনামূল্যে লাশবহন করা হচ্ছে। এর ভিতর ঢাকা হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর থেকে ৩৫ প্রবাসীর মৃতদেহ এবং খুলনা-যশোর-মণিরামপুর এর আশপাশের এলাকা থেকে ৭১ মৃতদেহ মোট ১০৬টি মৃতদের বহন এবং নামমাত্র মূল্যে সেবা দেওয়া হয়েছে ২৫৩০ রোগীকে। এই সকল তথ্য নিশ্চিত করে আমাদের অ্যাম্বুলেন্স কতৃপক্ষ জানান আর্তমানবতার সেবায় নিয়োজিত 'আমাদের অ্যাম্বুলেন্স' সেবা ইতোমধ্যে এলাকায় ব্যাপক সাড়া ফেলেছে।
আমাদের অ্যাম্বুলেন্স এর প্রতিষ্ঠাতা মহামারি কোভিড-১৯'র প্রাদুর্ভাবে মানুষ যখন দিশেহারা তখন যশোরের মণিরামপুরে মানবিক ডাক্তার খ্যাত মেহেদী হাসান নিরন্তর ছুটে চলেন কোভিডে আক্রান্ত রোগীদের বিনামূল্যে চিকিৎসা দিতে। শুধু মণিরামপুরেই তিনি সীমাবদ্ধ রাখেনি বিনামূল্যে চিকিৎসা সেবার। তিনি সারাদেশে কোভিড আক্রান্ত প্রায় ২০ হাজার রোগীকে বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা দিয়ে সুস্থ করেন। ফলে তিনি স্বল্প সময়ের মধ্যে মণিরামপুরে মানবিক ডাক্তার হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। তার এই অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ডা: মেহেদীকে ঢাকা বিভাগীয় কমিশনার অফিস এবং ইঞ্জিনিয়ারিং ইনস্টিটিউট (আইইইবি) থেকে সংবর্ধনা প্রদান করা হয়। এছাড়া তিনি ঢাকা ওআইসি ইয়ুথ ক্যাপিটাল ২০২০-র অধীনে ইয়ুথ ভলান্টিয়ার অ্যাওয়ার্ড লাভ করেন মহামান্য রাষ্ট্রপতির নিকট থেকে। ডাঃ মেহেদী হাসান বর্তমানে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএমইউ) প্যালিয়েটিভ মেডিসিন বিভাগে কর্মরত রয়েছেন। তিনি যশোরের মণিরামপুর উপজেলার শ্যামকুড় ইউনিয়নের আগরহাটি গ্রামের হাজী জবেদ আলীর কনিষ্ঠ সন্তান। ডাঃ মেহেদী চাকরির পাশাপাশি নিজ এলাকার মানুষের বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা দিয়ে আসছেন বহুদিন ধরে। দুই ঈদে গ্রামে বেড়াতে এসেও বিনামূল্যে চিকিৎসা সেবা দিয়ে থাকেন তিনি।
অ্যাম্বুলেন্সের সেবা সম্পর্কে বিশেষ এক সাক্ষাৎকারে মুক্তারপুর গ্রামের কৃষক রবিউল ইসলাম বলেন, "মালয়েশিয়ায় আমার শ্যালক আব্দুল খালেকের মৃত্যুর পর ধার-দেনা করে ১ জুন লাশ দেশে আনা হয়। শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ডা: মেহেদীর 'আমাদের অ্যাম্বুলেন্সে' বিনামূল্যে লাশ গ্রামের বাড়িতে আনা হয়। 'আমাদের অ্যাম্বুলেন্স' সেবার কথা আমরা কৃতজ্ঞতার সাথে মনে রাখব সব সময়।" ধলিগাতি গ্রামের মোঃ ইকবাল হোসেন বলেন "আমার দেড় বছরের মেয়ে অরশি খাতুন এর মৃতদেহ গত ১২ই মার্চ "আমাদের অ্যাম্বুলেন্স" মণিরামপুর থেকে ধলিগাতি গ্রামে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে পৌঁছে দিয়েছেন।"
কৃষ্ণবাটীর অসিত বৈরাগী বলেন "গত ২২শে মার্চ আমার কাকিমা রনিতা বৈরাগীর মৃতদের যশোর থেকে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে মণিরামপুর কৃষ্ণবাটী গ্রামে পৌঁছে দিয়েছেন তার জন্য একটি টাকাও নেয়নি।" শ্যামকুড় গ্রামের মোঃ হারুনা রশিদ বলেন "গত মার্চ মাসের ১৬ তারিখে আমার ৪ দিনের শিশু সন্তানকে খুলনা থেকে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে মণিরামপুর শ্যামকুড় গ্রামে পৌঁছে দিয়েছেন 'আমাদের অ্যাম্বুলেন্স'।"
২৪ ঘন্টা "আমাদের অ্যাম্বুলেন্স" সেবার সার্বিক দেখভালের দায়িত্বে থাকা পরিচালক মোঃ শাহ্ জালাল বলেন বিশ্বে বাজারে জ্বালানি তেলে মূল্য বৃদ্ধিতে আমরা হিমসিম খেয়ে যাচ্ছি আমরা যখন ২০২৪ সালে যাত্রা শুরু করি তখল এলপিজির মূল্য ছিল ৫৮ টাকা লিটার। বর্তমানে সেই এলপিজি ৮৯ টাকা লিটার কিনতে হচ্ছে। তবুও আমাদের
"মণিরামপুর উপজেলার পৌর শহরের আয়তনের মধ্যে রোগী আনা নেওয়ার জন্যে নির্ধারণ করা হয়েছে মাত্র চারশত টাকা। দশ কিলো অতিরিক্ত যেয়ে রোগী আনা- নেওয়া করলে কিলোমিটার হিসাব করে জ্বালানি খরচ হিসাবে ভাড়া নেওয়া হয়। মণিরামপুর থেকে যশোরে সাধারণ অ্যাম্বুলেন্সের ভাড়া যেখানে দেড় থেকে দুই হাজার টাকা সেখানে আমাদের অ্যাম্বুলেন্সে নেওয়া হয় মাত্র এক হাজার টাকা। ঢাকায় নিতে গুণতে হত ১৫ থেকে ১৭ হাজার টাকা। সেখানে আমাদের অ্যাম্বুলেন্সে নেওয়া হয় মাত্র আট হাজার টাকা। আর খুলনার জন্যে নেওয়া হয় তিন হাজার টাকা। এছাড়া গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বাংলাদেশের ভিতর আমরাই এই প্রথম মৃতদের সম্পূর্ণ বিনামূল্যে বহন করে থাকি। মণিরামপুর উপজেলারবাসীর মৃতদেহ দেশের যে প্রান্তে থাকুক না কেন আমরা সেটা সম্পূর্ণ বিনামূল্যে বহন করে থাকি। এমনকি ঢাকা থেকে মৃতদেহ আনার সময় পদ্মাসেতুর টোলসহ ছোটখাটো অনেক স্থানে টোল দেওয়া লাগে সেটাও আমরা বহন করে থাকি।" তিনি আরও বলেন আমরা প্রথম বছর পহেলা জুন-২০২৪ ইং থেকে ৩১শে মে ২০২৫ ইং পর্যন্ত "আমাদের অ্যাম্বুলেন্স" মোট সেবা দিয়েছে ১২২৭ জন রোগীকে। এর মধ্যে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে মৃতদেহ বহন করেছে ৫৩ টি ( প্রবাসী মৃতদেহ ৩০ টি) এবং নামমাত্র জ্বালানি খরচে সেবা দিয়েছেন ১১৭৪ জনের। এবং দ্বিতীয় বছর পহেলা জুন-২০২৫ ইং থেকে ৩০শে মে ২০২৬ ইং পর্যন্ত "আমাদের অ্যাম্বুলেন্স" মোট সেবা দিয়েছে ১৩৬৩ জন রোগীকে। এর মধ্যে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে মৃতদেহ বহন করেছে ৫৩ টি ( প্রবাসীর মৃতদেহ ৫ টি) এবং নামমাত্র জ্বালানি খরচে সেবা দিয়েছি ১৩১০ জনকে।
আমরা এই পর্যন্ত গত জুন-২০২৪ থেকে মে-২০২৬ মাস পর্যন্ত মোট সম্পূর্ণ ফ্রীতে মৃতদেহ বহন করেছি ১০৬ জনের। এর ভিতর ঢাকা থেকে মনিরামপুর আনা হয়েছে ৩৫ প্রবাসীর মৃতদেহ। এবং খুলনা, যশোর, কেশবপুর সহ মনিরামপুর থেকে মনিরামপুর বহন করা হয়েছে ৭১ জনের মৃতদেহ। নামমাত্র জ্বালানি খরচে সেবা দিয়েছি ২৫৩০ জনকে।
পারিবারিক অনুপ্রেরণা থেকেই সবসময় মানবতার সেবায় নিজেকে নিয়োজিত রাখার চেষ্টা করছি উল্লেখ করে 'আমাদের অ্যাম্বুলেন্স' সেবার প্রতিষ্ঠাতা ডা. মেহেদী হাসান বলেন "সাধারণ মানুষের মধ্যে যেভাবে সাড়া জেগেছে তাতে অনুপ্রাণিত হয়ে 'আমাদের অ্যাম্বুলেন্স' সেবার বহরে ফ্রিজিংসহ আরো তিনটি অ্যাম্বুলেন্স যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে আগামীতে।"